ডিপিসি নিউজ ডেস্ক: মুদ্রা একটি দেশের পরিচয় বহন করে। বিনিময়ের প্রধান উপকরণ মুদ্রা। মুদ্রার গুরুত্ব কতখানি তা বোধকরি দোকানে লজেন্স কিনতে চাওয়া ছোট্ট ছেলেটিও বুঝতে পারে। তাই তো যুগে যুগে প্রতিটি রাষ্ট্রই তার নিজস্ব মুদ্রাব্যবস্থা চালু করেছে এবং তা সংরক্ষণেরও ব্যবস্থা করেছে। শুধু কি তাই, প্রতিটি দেশের মুদ্রার মাঝে ছাপাঙ্কিত থাকে সেই দেশের জাতীয় বৈশিষ্ট্য। একটি জাতির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিও বোঝা যায় মুদ্রায় অঙ্কিত বিষয়াবলি থেকে। সেসব চিন্তা থেকেই বাংলাদেশেও এখন আছে আধুনিক একটি টাকা জাদুঘর। ২০১৩ সালের অক্টোবরে প্রতিষ্ঠিত হয় টাকা জাদুঘর। ঢাকার মিরপুরে বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেইনিং ইনস্টিটিউট কমপ্লেক্সের একটি অংশে গড়ে তোলা হয় জাদুঘরটি। এটিই বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম টাকা জাদুঘর। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের মুদ্রাব্যবস্থা। যুগভেদে তাদের পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও বিকাশ সম্পর্কে জানানোর উদ্দেশ্যেই মূলত এ উদ্যোগটি নেয়া হয়েছিল। মিরপুর ২ নম্বরে মেইন রোডেই বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেইনিং ইনস্টিটিউট কমপ্লেক্স। দৃষ্টিনন্দন কমপ্লেক্সটির টাকা জাদুঘর অংশের ভবনটির বাইরের দশা কিছুটা ভগ্নপ্রায় হলেও ভেতরে ঢুকেই মন ভালো হতে বাধ্য। ভবনের বাইরের দেয়ালে প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্য অসাধারণ টেরাকোটার ম্যুরালে চোখ আটকে যাবেই। ভেতরে ঢুকে আরো একবার চমক লাগবে। কারণ, সচরাচর বাংলাদেশের জাদুঘর বলতে সাধারণের সামনে যে দৃশ্যপট ভেসে ওঠে, তা পুরোই পাল্টে যাবে এখানে এলে। আধুনিক দৃষ্টিনন্দন আন্তর্জাতিক মানে সমৃদ্ধ একটি জাদুঘর। দু’টি গ্যালারিতে বিভক্ত করে সাজানো হয়েছে জাদুঘরটি। গ্যালারি ১-এ শুরুতেই রয়েছে এ উপমহাদেশের একদম প্রাচীন যুগগুলোর মুদ্রা। বঙ্গভূমির সেই প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আজ অবধি সব মুদ্রারই সংগ্রহ রয়েছে জাদুঘরে। অনেক দুর্লভ সংগ্রহ জাদুঘরটিকে সমৃদ্ধ করেছে। এমনকি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রের মুদ্রার সংগ্রহও আছে। প্রাচীন যুগের বিনিময় মাধ্যম কড়িও স্থান পেয়েছে মুদ্রা জাদুঘরের শোকেসে। রুপার তৈরি ছোট্ট মুদ্রাগুলো আলো পড়ে চকচক করছে। কিছু কিছু তো কালের পরিক্রমায় কালচেই হয়ে গেছে। তবুও এক ধরনের আকর্ষণ সৃষ্টি হয়। মোগল আমলের স্বর্ণমুদ্রাগুলো তো এখনো ঝলমল করছে। এ যেন দিব্যচোখে রাজকোষের ধনভাণ্ডার দেখা। আর কড়িগুলো দেখলেই কেমন যেন লাগে। বহু বছর আগে মানুষ এগুলো ব্যবহার করেছে। আজকের যুগে বসে ভাবা যায়, কড়ি দিয়ে ফাস্টফুড কেনার কথা! তারপর আরো রয়েছে ছাপা নোট। ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল ও পরবর্তী বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ের নোটগুলো। নিকেল তামার পয়সা। এক পয়সা, দুই পয়সা দেখে যে কারো ছোট্টবেলার কথা মনে পড়বে। এ ছাড়া অতীতকালের গ্রামীণ পরিবেশও ডিওরোমা (মাটির মডেল) তৈরি করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। গ্রামীণ বাজারব্যবস্থা, ব্যাংক প্রচলন, বিকিকিনি। রয়েছে মুদ্রা সংরক্ষণের আধার, পদ্ধতি, মুদ্রার সিল ও সুতা। এক কথায় যে কেউ মুদ্রাবিশেষজ্ঞ হয়ে গেলে অত্যুক্তি হবে না। গ্যালারি ২-তে স্থান পেয়েছে আন্তর্জতিক মুদ্রা। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন সময়ের মুদ্রা। আরো আছে স্মারক মুদ্রা। বিভিন্ন উপলক্ষে স্মারক মুদ্রা বা নোটের কালেকশন দেখতে পাবেন। তবে এ গ্যালারির সবচেয়ে বড় চমক হলো ফটোকিয়স্ক। গ্যালারির এক কোণে ছোট করে একটি স্টুডিও। তাতে মুদ্রা ছাপানো হয়! তাও যে সে মূল্যমান নয়, পুরো এক লাখ টাকার নোট! সে নোটে আবার আপনার ছবিও ছাপিয়ে নিতে পারেন। এ জন্য আপনাকে গুনতে হবে মাত্র ৫০ টাকা। তবে হ্যাঁ, নোটটি কিন্তু স্মারক। বিনিময়যোগ্য নয়। আরেকটি ব্যাপার না বললেই নয়, জাদুঘর কর্তৃপক্ষের শিষ্টাচার। আর প্রতিটি মুদ্রার পাশেই মুদ্রার ইতিহাস লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। কখন, কোথায় পাওয়া গেছে; তাও লেখা রয়েছে। জাদুঘরের সংগ্রহটি কোথা থেকে হয়েছে তা যেমন উল্লেখ করা আছে তেমনি অনেক ব্যক্তিগত সংগ্রহ থাকায় দানকারী সংগ্রাহকের নামটিও সম্মানপূর্বক লিখে দেয়া হয়েছে। সেটি মাত্র একটি পয়সা হলেও। কর্তৃপক্ষ জানালেন, চাইলে এখনো যে কেউ তার ব্যক্তিগত সংগ্রহটি দান করতে পারেন জাদুঘরকে। মিরপুর ১ নম্বর থেকে বড় ভাইয়ের সাথে ছোট্ট রিদোয়ান এসেছিল মুদ্রার ভাণ্ডার দেখতে। মনিপুর উচ্চবিদ্যালয়ে ক্লাস ফোরে পড়ে সে। বলল, বিভিন্ন দেশের মুদ্রা জমানোর শখ রয়েছে তার। এ রকম অসংখ্য দর্শনার্থী এখানে আসেন। তবে স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরাই বেশি আগ্রহী। প্রতিদিনই প্রায় দুই-আড়াই শ’ দর্শনার্থী আসেন। কথা হয় জাদুঘরের প্রধান গাইড মো: আবু আল হাসানের সাথে। তিনি বললেন, জাদুঘর প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্যই হলো বাংলার প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে সব পর্যায়ের মুদ্রার ইতিহাস, বিবর্তন ইত্যাদি সম্পর্কে মানুষকে জানানো। আগ্রহী করে তোলা। শুরু থেকেই চেষ্টা ছিল গতানুগতিক ধারার বাইরে একটি আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক ডিজিটাল জাদুঘর করা। তা ছাড়া যেহেতু এটি একটি সাবজেক্টিভ জাদুঘর এবং এর সাথে প্রতœতাত্ত্বিক বিষয়টিও জড়িত, যা বেশির ভাগ মানুষের বুঝের বাইরে। তাই আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করেছি সাধারণের বোধগম্য করে, সহজ করে উপস্থাপন করার। এলইডি টিভি, থ্রিজি, প্রজেক্টর, ডিজিটাল সাইনেজ অডিও গাইড ইত্যাদি পদ্ধতির সাহায্যে সাজানো হয়েছে। আরো বেশি কিছু জানতে আগ্রহীরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী তথ্য জানতে পারবেন। আরো জানালেন, জাদুঘরটির আয়তন বর্তমানে ছয় হাজার বর্গফুট। একটি স্যুভেনির শপও আছে। আরো বৃহৎ পরিসরে তৃতীয় তলায় পরিবর্ধনের পরিকল্পনা থাকলেও শিগগিরই হয়তো সেটা হচ্ছে না বিভিন্ন জটিলতায়। তবে এখনো যা আছে, তাও কিন্তু কম নয়। সরকারি ছুটির দিন ছাড়া অন্যান্য সব দিনই জাদুঘর খোলা থাকে বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। শুক্রবার বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। সাপ্তাহিক বন্ধ বৃহস্পতিবার। জাদুঘরে কোনো প্রবেশ ফি নেই। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে নাম, যোগাযোগের ঠিকানা, ফোন নম্বর এন্ট্রি করেই আপনাকে ঢুকতে হবে। বাংলার সমৃদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্যের অসাধারণ এক নিদর্শন দেখতে ও জানতে যেতে পারেন টাকা জাদুঘরে।

Author

ID NO : ডিপিসি নিউজ ডেস্ক:

Share Button

Comment Following News

E-mail : info@dpcnews24.com / dpcnews24@gmail.com

EDITOR & CEO : KAZI FARID AHMED (Genarel Secratry - DHAKA PRESS CLUB)

Search

Back to Top