ডিপিসি নিউজ ডেস্ক: অপরিশোধিত লবণ বা লবণের কাঁচামালের প্রায় শতভাগ আমদানি হয় প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে। আমদানিকৃত এসব লবণ বাংলাদেশের বন্দর পর্যন্ত নিয়ে আসার পর টনপ্রতি দাম পড়ে সর্বনিম্ন ২০ ডলার থেকে সর্বোচ্চ ২৫ ডলার। সে হিসাবে বন্দরে পৌঁছানো পর্যন্ত কেজি প্রতি লবণের দাম পড়ে সর্বোচ্চ ১ টাকা ৯৫ পয়সা। কিন্তু হাত বদল হয়ে এ লবণ পরিশোধন মিল পর্যন্ত আসতে প্রতি কেজির দাম দাঁড়ায় ১৫ টাকা ৫৪ পয়সা থেকে ১৬ টাকা ২২ পয়সা। এর পর প্রক্রিয়াজাত শেষে ভোক্তাদের কাছে প্রতি কেজি লবণ বিক্রি করা হয় ৪০-৪২ টাকায়। নারায়ণগঞ্জের লবণ আমদানিকারকদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতি কেজি অপরিশোধিত লবণে ভ্যাট দিতে হয় ১১৬ শতাংশ। এ লবণ চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জ পৌঁছাতে ৭৪ কেজির বস্তায় পরিবহন ভাড়া দিতে হচ্ছে ৭০ টাকা, নদীর ঘাটে দেয়া হচ্ছে বস্তাপ্রতি ৫ টাকা, ঘাট থেকে গুদামে পৌঁছাতে শ্রমিককে দেয়া হচ্ছে বস্তাপ্রতি ১০ টাকা এবং বস্তা কিনতে ব্যয় হচ্ছে ১০ টাকা। সব মিলে ৭৪ কেজির এক বস্তা লবণ নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত পৌঁছাতে মোট ব্যয় হচ্ছে ৪৬০ টাকা। এ হিসাবে প্রতি কেজি লবণের কাঁচামালের দাম পড়ে ৬ টাকা ২২ পয়সা। লবণের কাঁচামাল অস্বাভাবিক দামে বিক্রি হওয়ার কথা স্বীকার করেন নারায়ণগঞ্জ লবণ আড়তদার মালিক সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি মামুন-উর-রশিদ। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, দেশে লবণের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতি থাকায় সরকার তিন দফায় আড়াই লাখ টন লবণ আমদানির সুযোগ দেয়। এ লবণের কাঁচামাল ১৬ টাকায় বিক্রি হওয়াটা অস্বাভাবিক। কাঁচামাল বিক্রিতে ব্যবসায়ীরা অস্বাভাবিক মুনাফা করছেন বলে মনে করেন তিনি। এদিকে কক্সবাজারের লবণ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কৃষক পর্যায়ে বর্তমানে প্রতি কেজি লবণ বিক্রি হচ্ছে ১০ টাকা থেকে ১১ টাকা ২৫ পয়সা। আর মধ্যস্বত্বভোগী পর্যায়ে ১১ টাকা ২৫ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৫০ পয়সায়। আর ম্যানুয়াল মিলাররা প্রতি কেজি লবণ বিক্রি করছেন ১২ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে ১৪ টাকায়। অথচ অটোমিলাররা প্রতি কেজি লবণ বিক্রি করছেন ৩৫-৪০ টাকায়, যা রাজধানীর বাজারে খুচরা পর্যায়ে ৪০-৪২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে বাজারে প্যাকেটজাত লবণ উত্পাদন করছে এমন উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আছে— এসিআই সল্ট লিমিটেড, ইউনাইটেড সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, পূবালী ভ্যাকুয়াম ইভ্যাপোরেটেড সল্ট প্লান্ট, ডায়না ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেড, মোল্লা সল্ট (ট্রিপল রিফাইন্ড) ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, ক্রিস্টাল, মধুমতিসহ বেশকিছু প্রতিষ্ঠান। দেশে লবণ বাজারজাত হচ্ছে ভ্যাকিউম, মেকানিক্যাল ও সনাতন এ তিন পন্থায় পরিশোধন হয়ে। ভ্যাকিউম, মেকানিক্যাল পদ্ধতিতে পরিশোধিত হয় ৬০ শতাংশ লবণ। এ দুই পন্থায় বাজারজাত হওয়া লবণের বাজারে ৮০ শতাংশ দখল করে আছে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৩০। এদিকে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন বলছে, ভারত থেকে প্রতি কেজি লবণ ৮০ পয়সায় কেনা হয়। ট্রেড ভ্যালু কেজিপ্রতি আরো ৮০ পয়সা, ৯২ শতাংশ শুল্ক এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক সব খরচ মিলে কেজিপ্রতি লবণের কাঁচামাল সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ টাকার উপরে হবে না। লবণ মিল মালিক সমিতি সূত্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যে কেনা লবণের সঙ্গে যৌক্তিক কিছু খরচ যোগ হয়। এর মধ্যে আছে জাহাজ ভাড়া, পরিবহন খরচ, সরকারি কর। এসব খরচ যোগ করে কেজিপ্রতি অপরিশোধিত লবণের দাম সর্বোচ্চ ৫ টাকা হতে পারে। কিন্তু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৫ টাকায়। মূলত এর পেছনে আছে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীর কারসাজি। লবণ আমদানিতে সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির কারণে এ অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যের প্রকাশ ঘটছে। আমদানির অনুমোদন পাওয়া নামসর্বস্বরাই অতিরিক্ত মুনাফা করছেন। আর এ প্রবণতার দরুন অস্বাভাবিক পর্যায়ে রয়েছে বাজারজাতকৃত লবণের দাম। জানা গেছে, সরকার চলতি মৌসুমে মোট ২৪১টি প্রতিষ্ঠানকে ভোজ্য ও শিল্প লবণ আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে ৭০-৮০টি প্রতিষ্ঠানের লবণ পরিশোধনের মিল রয়েছে। বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো নামসর্বস্ব। সরকার প্রতিষ্ঠানপ্রতি ৬১৯ টনের বেশি লবণ আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। অর্থাত্ যাদের মিল আছে এবং যারা নামসর্বস্ব উভয় ধরনের ব্যবসায়ী— একই পরিমাণ লবণ আমদানির অনুমোদন পেয়েছে। যদিও যাদের মিল আছে, তারা ৬১৯ টনের দ্বিগুণ লবণ পরিশোধনের সক্ষমতা রাখে। মিল সচল রাখতে বাধ্য হয়ে তারা অন্য আমদানিকারকের থেকে বেশি দামে কাঁচামাল বা অপরিশোধিত লবণ কিনছেন। অতিরিক্ত দাম দিয়ে কেনা অপরিশোধিত লবণ পরিশোধনের পর তা বিক্রিও হচ্ছে অস্বাভাবিক দামে। বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি পরিতোষ কান্তি সাহা বলেন, লবণ আমদানির পর কিছু যৌক্তিক খরচ যোগ হয়। এটি তেমন কোনো সমস্যা তৈরি করে না। কিন্তু লবণ আমদানির অনুমোদন যারা পেয়েছেন, তাদের মধ্যে ৭০-৮০টি ছাড়া বাকিরা সবাই নামসর্বস্ব। যদিও সমপরিমাণ লবণ আমদানির অনুমোদন পেয়েছে সবাই। অনুমোদন পাওয়া আমদানিকারকদের মধ্যে যাদের বিপুল পরিমাণ পরিশোধন ক্ষমতা আছে, তারা পড়ছেন বিপাকে। মিল চালু রাখতে বাধ্য হয়েই নামসর্বস্বদের কাছ থেকে ক্রুড লবণ কিনছেন। আর সুযোগ বুঝে নামসর্বস্বরা ৫ টাকার পণ্য ১৫ টাকায় বিক্রি করছেন। এভাবেই আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজারে লবণের কাঁচামালের মূল্যে অস্বাভাবিক পার্থক্য থেকে যাচ্ছে। বাংলাদেশ লবণ মিল মালিক সমিতির সহসভাপতি সৈয়দ মনিরুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যে দামে কিনে লবণ আমদানি করা হয়, তার সঙ্গে অনেক খরচ যোগ হয়। এর মধ্যে আছে জাহাজীকরণ ব্যয়, কর, পরিবহন, শ্রমিকের মজুরি। তবে দামের অস্বাভাবিক পর্যায় সৃষ্টি হয় অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতায়। এ প্রবণতার কারণেই লবণের মূল্য বর্তমানে অস্বাভাবিক পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) সূত্রে জানা গেছে, প্রতি কেজি লবণ উত্পাদন থেকে আয়োডিন মেশানো, প্যাকেজিং ও আনুষঙ্গিক খরচ হিসাব করলে সর্বোচ্চ ৮ টাকার বেশি হওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। অথচ বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি আয়োডিনযুক্ত লবণ বিক্রি হচ্ছে ২৮-৪২ টাকায়। এতে একদিকে কৃষক উত্পাদন করে ঠকছেন, অন্যদিকে ভোক্তাকেও অতিরিক্ত দামে তা কিনতে হচ্ছে। বিসিকের তথ্য অনুযায়ী, বছরে লবণের চাহিদা রয়েছে ১৬ লাখ টন। এর মধ্যে খাবার লবণ আট লাখ টন এবং শিল্পে ব্যবহূত বাকি আট লাখ টন। ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত দেশে লবণ উত্পাদন হয়েছে ১৭ লাখ ৫৩ হাজার টন। এর মধ্যে খাবার লবণ উত্পাদন হয়েছে ৮ লাখ ৩৫ হাজার টন। নতুন লবণ নীতিতে ২০১৬-২০ সাল পর্যন্ত ভোজ্য লবণের চাহিদা নির্ণয় করা হয়েছে। বর্তমানে দৈনিক জনপ্রতি ভোজ্য লবণের চাহিদা ১৪ দশমিক ৫ গ্রাম। এ হিসাবে বার্ষিক চাহিদা নির্ণয় করা হয়েছে। তবে ভোজ্য লবণের পরই শিল্প লবণ বেশি ব্যবহার হয়ে থাকে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে বার্ষিক ভোজ্য লবণের চাহিদা ছিল ৮ লাখ ৪৮ হাজার টন, শিল্প লবণের চাহিদা ৩ লাখ ৪৮ হাজার টন, মত্স্য প্রক্রিয়াজাত লবণের চাহিদা ৬৯ টন এবং প্রাণী খাতে ব্যবহূত লবণের চাহিদা ২ লাখ ২ টন। সূত্র: বণিক বার্তা

Author

ID NO : ডিপিসি নিউজ ডেস্ক:

Share Button

Comment Following News

E-mail : info@dpcnews24.com / dpcnews24@gmail.com

EDITOR & CEO : KAZI FARID AHMED (Genarel Secratry - DHAKA PRESS CLUB)

Search

Back to Top