বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ বিশ্ব ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় স্বাতন্ত্র্যে ভরপুর। এই মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অহঙ্কার। এই মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা নিজের জীবন বাজি রেখে শত্রু মোকাবেলা করেছেন তারা যুগ যুগ ধরে আমাদের হৃদয়ে মর্যাদার আসনে স্থান করে রেখেছেন। এই মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া এক অসম সাহসী বীর একজন সাধারণ পরিবারের ছেলে। নাম তার রুহুল। মা আদর করে তার নাম দিয়েছেন রুহুল। মা জুলেখা খাতুন বাবা আজহার পাটোয়ারি মিঞা ছোট কাল হতে রুহুলের ভিতর এক অসামান্য প্রতিভা দেখতে পেয়েছিলেন। সবার সাথে তার ছেলেটি অনায়াসে মিশে যেতে পারতেন। অকৃত্রিম বন্ধুবৎসল, সদা হাসিমুঝখ, মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা ইত্যাদি চরিত্রের অধিকারি ছিলেন রুহুল। নিজের সহজ-সরল স্বভাব দিয়ে যে কোন আড্ডার মধ্যমণী হতে সময় নেন না পলকমাত্র। এমনি চরিত্রের অধিকারি রুহুলের আচরণ দেখে বাবা তাকে নিয়ে ভীষণ আশাবাদী ছিলেন। গ্রামের কোন মানুষের কোন সমস্যায় সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। কোন দ্বিধা ছিল না তার। মুক্তিযুদ্ধের শুরুর প্রারম্ভেই রুহুলের জীবনে এক বড় সংকট তৈরি হয়। তার প্রাণপ্রিয় স্ত্রী জাকিয়া ছোট ছোট ছয় সন্তান রেখে এ পৃথিবী হতে বিদায় নেয়। সংসারে আরো চার বোন ২ ভাই, মা-বাবা। এত কিছুর পরও রুহুল মা-মাটি দেশের কথা ভেবে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। বাবার যুদ্ধে যাওয়ার কথা শুনে ১০ বছর বয়সের মেয়ে নারগীছ কান্না-কাটি শুরু করে। ছোট ছোট ভাইবোনগুলোকে কে দেখবে কি হবে তাদের এ সকল চিন্তা করে নারগীছ প্রায় দিশেহারা। বাবা রুহুল মেয়েকে সারা জীবনের একটা দিক নির্দেশনা দিলেন। বসে বসে অনেক বুঝালেন। কঠিন ও কঠোর এ পিতা বোঝালেন কিন্তু নিজে বুঝলেন না। কি অসহায় করে যাচ্ছেন এই পরিবারটিকে। তার যাওয়া যে পরিবারটিকে শেষ করে দেয়া এক মুহুর্তের জন্য তিনি ভাবলেন না। মা জুলেখা খাতুন ছিলেন অত্যন্ত সহজ-সরল। ছেলের এহেন সিদ্ধান্ত মা মেনে নিতে পারেন নি। আবার এই দুর্দিনে দেশের কাজে আসবে। দেশ মাতৃকার সেবা এই পুত্র যে তার কত যোগ্য একমাত্র তিনিই জানেন। কঠিন করে নিষেধ করতে পারলেন না। শুধু বললেন- ‘তোর মা-হারা এই সন্তানগুলোকে কে দেখবে বাবা, তুই কেন চলে যাইতেছস, তুই যাসনে বাবা’। মায়ের আকুতি, বাবার নিষেধ, সন্তানের আহাজারি সব কিছুকে পিছনে ফেলে পুত্র রুহুল একটি কথাই বললেন- মা আমার জন্য চিন্তা করো না, আমি মরলে যে দাম এবং বাঁচলেও আমার দাম তেমনি থাকবে। যে দেশের জন্য আমি জীবন দিতে যাচ্ছি সে দেশ আমার সন্তান ও আমার পরিবারকে দেখবে। তুমি ভেবো না মা”। রুহুল জীবীত কালীন যে কথা বলেছে সত্যিই বাস্তবে সেটি হয়েছে। এই মা জুলেখা খাতুনকে বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীতে ঢাকায় নিয়ে যান এবং তার হাতে তার পুত্রের ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ সন্মাননা সার্টিফিকেট তুলে দেন এবং মারা যাওয়ার পর রাষ্ট্রীয় সম্মানে তাঁকে দাফন করা হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মা জুরেখা যে রাস্তা দিয়ে রুহুল চলে গিয়েছেন তার পানে সব সময় চেয়ে থাকতেন। রুহুলের শহীদ হওয়ার খবর পেয়ে বাবা আজহার তৎক্ষণাৎ বুকে হাত দিয়ে বিছানা পড়ে যান এবং মৃত্যুমুখে পতিত হন। অনাদরে অবহেলায় তার ছোট সন্তানটি মারা যায়। “এক পা নেই, দু হাতে দুটো ক্রাচ ধরে আস্তে আস্তে একজন মানুষ বাড়িতে প্রবেশ করল। তখন ঘরময় বাতাসে পর্দাগুলো উড়ছে। জানালার ফাঁক দিয়ে মানুষটি ভিতরে উঁকি দিয়ে দেখল ভেতরের মানুষগুলো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। এরা তো সবাই ভালোই আছে। ঘুমন্ত মানুষগুলোকে দেখেই মানুষটি বুঝল এদের কাছে আমার প্রয়োজন নেই’। মানুষটি যেমন করে এলো ঠিক তেমনি করে আবার চলেও গেলো”। এই মানুষটি আর কেউ নয়। আমাদের বাবা। আমাদের জন্মদাতা বাবা। এই স্বপ্নটা দেখি এই জন্য যে আমরা কখনও বাবার লাশটি দেখিনি। সুপ্ত মনে সদা জাগরুক হয়ে আছে- বাবা আমার আছে, বেঁচে আছে। আমাদের সব কর্মকা- আমার বাবা দেখতে পাচ্ছেন। আমাদের চারপাশেই আমার বাবা সর্বদা বিচরণ করছেন। অনেক বড় বিপদে কেমন করে যেন রেহাই পেয়ে যাই। মনে হয় আমার বাবা আমাকে বিপদ হতে উদ্ধার করছেন। অনেক বড় সমস্যা দুই/তিন দিন ভাবছি। হঠাৎ একটা সমাধান হয়। জীবনে চলার পথে বাবার অভাব যে কি রকম অনুভব করেছি তা একমাত্র আমাদের পরিবারটিই বুঝতে পেরেছে। ১৯৭১ সালে বাবা ঘর ছেড়ে গেছেন। পেছনে রেখে গিয়েছেন মা হারা ছয় সন্তান অবিবাহিত বোন, কর্মহীন ভাই ও মা-বাবা। এ পরিবারটি দেখার কেউ ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের পর আমরা অনেক অসহায় হয়ে পড়েছিলাম। আমার নানা আজহার মিঞা এবং নানী ছালেহা খাতুন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আমাদের সহযোগিতা করেন। অনেক সময় ভাবি আমার বাবার এভাবে যাওয়া উচিত হয়নি। একজন সাধারণ মা-বাবার সন্তান হয়ে কিভাবে একজন মানুষ এত অসাধারণ হতে পারে? পৃথিবীতে কেউ অবিনশ্বর নহে। জন্মিলে মরিতে হবে। আমার বাবার মৃত্যু আমাদের চলার পথ অনেক কণ্টকাকীর্ণ করলেও এ ভেবে সুখ পাই যে, আমার বাবা কোন সাধারণ ব্যক্তি নয়। বিশ্বের যে কোন দেশে আমার বাবাকে এক নামে চিনে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমীন। বিনা চিকিৎসায় আমার ছোট ভাই মানসিক ভাবে অসুস্থ, বড় ভাই মো. আলী এ পৃথিবীতে নেই। আমরা তথা আমাদের পরিবারটি এত বেশি কষ্টের মধ্যে ছিলাম যে, কখনো খেয়ে কখনো না খেয়ে জীবনাতিপাত করেছি। এক সময় নৌবাহিনী থেকেই বলছিল এদের কোন অভিভাবক যেহেতু নেই এদের এতিমখানায় পাঠিয়ে দেয়া হোক। শহিদ পরিবার হওয়ার কারণে বঙ্গবন্ধু ও তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আস্থাভাজন হওয়ায় ৭৫ পরবর্তী সময়ে আমরা অনেকটা লুকিয়ে জীবনযাপন করতে হত। বার বার আমাদের পরিবারের প্রতি আঘাত আসার পরও বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমাদের পুরো পরিবার ছিল/আছি/থাকব চিরকাল আস্থাশীল বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসি বলেই ২০০৯ সালে আমাদের পুরো পরিবারটিকে ভাতের সাথে বিষ প্রয়োগে মেরে ফেলতে চেয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা বিরোধী শক্তিরা। বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক পত্রিকা আজাদীসহ বিভিন্ন পত্রিকায় এটি ছাপিয়েছিল। বাংলাদেশ নৌবাহিনী যদি তড়িৎ ব্যবস্থা না গ্রহণ করত তাহলে পরিবারের প্রায় সদস্য সেদিন মৃত্যুমুখে পতিত হত। নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত এই বীর পরিবারটি। সেই ১৯৭১ সালের ষড়যন্ত্রকারীরা এখনো আমাদের সমাজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যে কোন সময় তাদের কালো থাবা আমার বাবাদের মত দেশ প্রেমিকদের কে শেষ করছেই তাদের পরিবারকে পর্যন্ত রেহাই দেয় নি। আমি ব্যক্তি পর্যায়ে কয়েকটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছি। আমার বাবার নামে নোয়াখালী জেলার শহীদ রুহুল আমিন উচ্চ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সেটি আমাদের পরিবার হতেই প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। চট্টগ্রামে রাঙ্গুনিয়াতে উত্তর পোমরা উচ্চ বিদ্যালয় টি আমার বাবার নামে প্রথম নামকরণ করা হলেও প্রশাসনিক অসহযোগিতার কারনে পরবর্তীতে সেটি স্থানীয় জায়গার নামে নামকরণ করা হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছে আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখা করি, কিন্তু তিন যাদের নির্দেশ প্রদান করেন তারা তা রাখেন নি। বর্তমানে স্কুলটিতে প্রায় ৬০০ জন ছাত্র-ছাত্রী পড়াশোনা করছে। প্রথমে আমার স্বামীর দেয়া খরচে শিক্ষকদের বেতন দেয়া হলেও পরবর্তীতে স্কুলটি এমপিওভুক্তি হয়। দেশের সেবা, দেশের মানুষের সেবা করাই হচ্ছে আমি এবং আমাদের পুরো পরিবারের উদ্দেশ্য। জীবনে দেশ সেবা করার যদি কোন সুযোগ পাই তাহলে বঙ্গবন্ধু আদর্শে ভরা সোনার বাংলা গঠন কল্পে জীবন বিসর্জন দিতে কুণ্ঠাবোধ করব না। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যাকে একবার সেনাকুঞ্জে প্রশ্ন করেছিলাম - আপা আপনি ঢাকা থেকে সব মহিলা সাংসদ নির্বাচন করেছেন, যারা কখনও গ্রামে যাবেনা, আপনি চট্টগ্রামে মাত্র দু’জন মহিলা সাংসদ নিয়েছেন। ’ আমার নেত্রী আপা তার মিষ্টি হাসি দিয়ে আমাকে বলেছিলেন - তোমার বয়স এখন কম। পরের বার তোমার কথা ভেবে দেখব। আমি আমার আপার কথায় আশাবাদী। দেশের উপকারে যেন নিজেকে বিসর্জন দিতে পারি সে সুবর্ণ অপেক্ষায় আছি এবং থাকব। আজ ১০ই ডিসেম্বর। বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিন রূপসার বুকে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন বীরের মত। দেশ মাতৃকার জন্য, পরিবার, সন্তান, মাতা-পিতা, ভাই-বোন কাউকে মনে স্থান দেননি। দেশকে সবার উপরে তুলে ধরেছেন। যেখানে নিপুন সাঁতারু এই বাবা আমার অনায়াসে বেঁচে থাকতে পারতেন কিন্তু সেখানে তিনি নিজের জীবন বাজি রেখে জাহাজকে রক্ষা করার জন্য শেষ পর্যন্ত শত্রু অভিমুখে কামান চালিয়ে গেছেন এবং নিজেকে দেশের জন্য উৎসর্গ করেছেন। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর এই বীর বাবাকে মাথা নিচু করে স্যালুট করি। সাথে সাথে শ্রদ্ধা জানাই আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে যিনি এই বীরকে তার যোগ্য সম্মান বীরশ্রেষ্ঠ পদকে ভূষিত করেছেন। এই অভিসাংবাদিত বিশ্ব নেতাকে আন্তরিকভাবে সালাম জানাই। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনা তৃণমূলে যে সকল মুক্তিযোদ্ধাদের শহীদ পরিবারদের যারা কখনও জাতীয়ভাবে মূল্যায়িত হয়নি তাদেরকে তিনি সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেছেন এবং মূল্যায়ন করেছেন। আশার কথা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি ওয়েভ সাইট করা হচ্ছে যেখানে সব ধরণের মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচিতি রক্ষিত থাকবে। তাদের সব ধরনের সমস্যা গুলো একটি ফিতায় আবদ্ধ করা হবে। যেখানে মুক্তিযোদ্ধা মানেই গরীব, মুক্তিযোদ্ধা মানেই গৃহহীন এই ধারণাটা বদলে যাবে। যার ডাকে সাড়া দিয়ে এ সকল মুক্তিযোদ্ধারা সব হারিয়েছে, তার সুযোগ্য কন্যা এ সকল মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারগুলিকে সঠিকভাবে মূল্যায়ণ করছেন এবং ভবিস্যতেও করবেন এটা আশা করি। এই কাজগুলো করার জন্য আমাদের দেশনেত্রীকে আল্লাহ্ যেন সুষ্ঠ রাখেন, দেশদ্রোহীদের কুনজর থেকে রক্ষা করেন সব সময় এই দোয়া করি। আজ ১০ই ডিসেম্বর দিবসকে সামনে রেখে সকলের কাছে একটিই আহবান এ বীর যে উদ্দেশ্য নিয়ে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছেন সে উদ্দেশ্যকে আমরা বাস্তবে রূপ দিতে সদা প্রস্তুত থাকব। এ বীরের কীর্তি সদা জাগরুক রবে আজীবন। আমরা সকলে এ বীর এবং তার পরিবারের জন্য দোয়া ও মঙ্গল কামনা করি।

Author

ID NO : ফাতেমা আমিন

Share Button

Comment Following News

E-mail : info@dpcnews24.com / dpcnews24@gmail.com

EDITOR & CEO : KAZI FARID AHMED (Genarel Secratry - DHAKA PRESS CLUB)

Search

Back to Top