
গণ-অভ্যুত্থানের গ্রাফিতির বইয়ের প্রচ্ছদকে ‘গ্রেটার বাংলাদেশের মানচিত্র’ হিসেবে দাবি করে ভারতীয় গণমাধ্যমে ধারাবাহিক অপপ্রচার চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর ফ্যাক্টচেক ও মিডিয়া রিসার্চ টিম বাংলাফ্যাক্ট।
এক অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাফ্যাক্ট।
🔹 ভারতীয় গণমাধ্যমে ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ প্রপাগান্ডা
বাংলাফ্যাক্ট জানায়, ভারতের মূলধারার একাধিক গণমাধ্যম সম্প্রতি ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ঘিরে নিয়মিত গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করছে।
একটি গ্রাফিতির বইয়ের প্রচ্ছদে থাকা চিত্রকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে এসব গণমাধ্যম একে কখনো ‘যুদ্ধ পরিকল্পনা’, কখনো ‘ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’ হিসেবে তুলে ধরছে।
বাংলাফ্যাক্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৩ নভেম্বর, প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূস তুর্কি সংসদীয় প্রতিনিধিদলকে ‘আর্ট অব ট্রাইঅম্ফ’ নামের একটি গ্রাফিতি বই উপহার দেন। বইটির প্রচ্ছদে শহীদ আবু সাইদ ও বাংলাদেশের মানচিত্রনির্ভর একটি দেয়ালচিত্র রয়েছে।
এই প্রচ্ছদের চিত্রটিকেই ভারতের ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ফার্স্ট পোস্ট, ইন্ডিয়া ডটকম ও এবিপি লাইভ সহ একাধিক গণমাধ্যমে ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ মানচিত্র উপহার দেওয়া হয়েছে— এমন দাবি করে প্রচার চালানো হয়।
এমনকি নিউজ ১৮ বইটিকে “ডকুমেন্ট” আখ্যা দিয়ে দাবি করে, এতে নাকি “যুদ্ধ পরিকল্পনা” লিপিবদ্ধ রয়েছে— যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মনগড়া বলে প্রমাণ পেয়েছে বাংলাফ্যাক্ট।
🔹 বইটির প্রকৃত প্রেক্ষাপট
বাংলাফ্যাক্ট জানায়, ‘আর্ট অব ট্রাইঅম্ফ’ বইটি ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের আঁকা গ্রাফিতির সংকলন। এটি সরকারি বা কোনো আন্তর্জাতিক প্রকল্প নয়।
ড. ইউনূস এই বইটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৯তম অধিবেশনে (সেপ্টেম্বর ২০২৪) অংশ নেওয়ার সময় জো বাইডেন, বিল ক্লিন্টন, জাস্টিন ট্রুডোসহ বিভিন্ন বিশ্বনেতার হাতে তুলে দেন।
পরবর্তীতে বহু কূটনীতিক ও বিদেশি প্রতিনিধি এই বইটি উপহার হিসেবে পেয়েছেন — এমনকি গত বছর ৯ ডিসেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রকেও বইটি দেখান প্রধান উপদেষ্টা।
বইটির প্রচ্ছদের মানচিত্র মূলত একটি ছাত্র-আঁকা গ্রাফিতি, যা বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক মানচিত্রের সঙ্গে আকারে পুরোপুরি মিল না থাকলেও, এর মধ্যে বাংলাদেশের বাইরে কোনো ভূখণ্ড অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলে জানিয়েছে বাংলাফ্যাক্ট।
🔹 অপপ্রচারের ধারাবাহিকতা
বাংলাফ্যাক্ট জানায়, গত ১৫ অক্টোবর ড. ইউনূস পাকিস্তানের যৌথ বাহিনীর চেয়ারম্যান জেনারেল সাহির শামশাদ মির্জার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সময় বইটি উপহার দিলে, ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো প্রচার শুরু করে যে—
“ড. ইউনূস পাকিস্তানি জেনারেলকে এমন একটি মানচিত্র উপহার দিয়েছেন, যেখানে বাংলাদেশের পতাকায় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল যুক্ত করা হয়েছে।”
বাংলাফ্যাক্ট অনুসন্ধান করে দেখতে পায়, এই দাবিও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
এমন প্রপাগান্ডা এবারই প্রথম নয়। চলতি বছরের পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত একটি প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করেও ভারতীয় গণমাধ্যমে একই ধরনের গুজব ছড়ানো হয়েছিল।
🔹 ‘সালতানাত-ই-বাংলা’ গুজবের সত্যতা নেই
তখন ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দি ইকোনমিক টাইমস একটি প্রতিবেদনে দাবি করে, তুরস্কভিত্তিক একটি এনজিও নাকি বাংলাদেশে ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ প্রচার করছে।
বাংলাফ্যাক্ট অনুসন্ধান করে দেখতে পায়, ‘সালতানাত-ই-বাংলা’ নামে কোনো সংগঠনের অস্তিত্ব বা কার্যক্রমের প্রমাণ নেই।
আসলে ওইদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি-তে ‘সেন্টার ফর বেঙ্গল স্টাডিজ (সিবিএস)’ আয়োজিত প্রদর্শনীতে ইতিহাসভিত্তিক প্রাচীন বাংলা সালতানাতের মানচিত্র প্রদর্শিত হয়েছিল — যা কোনো রাজনৈতিক মানচিত্র নয়।
🔹 বিষয়টি ভারতের পার্লামেন্ট পর্যন্ত গড়ায়
ওই গুজবের পরিণতিতে, ৩১ জুলাই ভারতের রাজ্যসভায় কংগ্রেস নেতা রণদীপ সিং সুরজেওয়ালা ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ প্রসঙ্গ তোলেন।
এর জবাবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর এক লিখিত বিবৃতিতে বাংলাফ্যাক্টের প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করে বলেন,
“বাংলাফ্যাক্ট জানিয়েছে, ‘সালতানাত-ই-বাংলা’ নামে কোনো সংগঠনের অস্তিত্ব নেই; প্রদর্শনীতে দেখানো মানচিত্রটি ছিল ইতিহাসভিত্তিক।”
🔹 বাংলাফ্যাক্টের অবস্থান
বাংলাফ্যাক্ট জানায়,
“একটি গ্রাফিতির বইয়ের প্রচ্ছদকে কেন্দ্র করে ভারতীয় গণমাধ্যম ধারাবাহিকভাবে প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে। বাস্তবে এটি শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে আঁকা দেয়ালচিত্র, যা ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’-এর সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পর্কিত নয়। এই প্রচারণা যেমন ভিত্তিহীন, তেমনি হাস্যকরও।”
সংস্থাটি আরও জানায়, গত বছর থেকে ভারতীয় ও দেশীয় কিছু গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পেজ থেকে বাংলাদেশবিরোধী গুজব ও ভুয়া তথ্য প্রচার বেড়েছে— বিশেষত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও চব্বিশের আন্দোলনে অংশ নেওয়া দলগুলোর বিরুদ্ধে।
ইতোমধ্যে বাংলাফ্যাক্ট ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া শতাধিক ভুয়া তথ্য শনাক্ত করেছে এবং গুজব ও অপতথ্য প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।













