
ভোলা থেকে ঢাকাগামী লঞ্চ থেকে নদীতে ’ঝাঁপ দেওয়ার’ চার দিন পর এক কলেজ ছাত্রীর লাশ উদ্ধারের পর তার মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় ছাত্রদলের রাজনীতিতে ওই ছাত্রী সক্রিয় ছিলেন বলে তথ্য দিয়েছেন তার স্বজন ও সহপাঠীরা।
এ ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে মঙ্গলবার ভোলা শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভার ডাক দিয়েছে ভোলা সরকারি কলেজ ছাত্রদল।

ভোলা সরকারি কলেজের তৃতীয় বর্ষের ওই শিক্ষার্থীর এভাবে মৃত্যুকে মেনে নিতে পারছেন না তার সহপাঠী ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা নানা প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের কারও কারও দাবি, এটি পরিকল্পিত হত্যা। আবার কেউ দাবি করছেন, লঞ্চে ‘ধর্ষণের শিকার’ হয়ে ওই ছাত্রী নদীতে ঝাঁপ দিয়ে ‘আত্মহত্যা’ করেছেন।
এর আগে শনিবার রাতে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চর রমনী মোহন ইউনিয়নের বুড়িরঘাট এলাকায় মেঘনা নদীর তীর থেকে লাশটি উদ্ধার করা হয় বলে জানান ভোলা সদর মডেল থানায় ওসি হাসনাইন আহমেদ পারভেজ।
লাশ উদ্ধারের পর প্রথমে নাম-পরিচয় না পাওয়ায় ময়নাতদন্ত শেষে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের কাছে দাফনের জন্য হস্তান্তর করা হয়। পরে রোববার বিকালে ওই ছাত্রীর বাবা মেয়ের ছবি ও জামাকাপড় দেখে লাশ শনাক্ত করেন।
পরে পুলিশ জানতে পারে মৃত ওই শিক্ষার্থী ভোলা সদর উপজেলার বাসিন্দা এবং সরকারি কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন।
গত ১৭ জুন ঢাকাগামী এমভি কর্ণফুলী-৪ লঞ্চ থেকে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে নিখোঁজ হন বলে পুলিশকে জানানো হয়েছিল। তার বাবা মেয়ে নিখোঁজের পর ভোলা সদর মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন।
তার বাবা বলেন, “কলেজ ছাত্রদল আসন্ন কাউন্সিলে গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রার্থী ছিলেন তার মেয়ে। ১৭ জুন সকালে বাসা থেকে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার কথা বলে বের হন। পরে আর বাসায় ফেরেনি।”
তিনি বলেন, বোরহানউদ্দিন উপজেলায় এক যুবকের সঙ্গে তার মেয়ের সম্পর্ক ছিল। এ তথ্য পুলিশকে জানিয়েছেন তিনি। এটি হত্যা না কি আত্মহত্যা ? তা তদন্ত করে বের করার দাবি তার।
কী ঘটেছিল সেদিন ?
এমভি কর্ণফুলী-৪ লঞ্চের সুপারভাইজার নান্টু বাবু বলেন, ঘটনার দিন ভোলার ইলিশা ঘাট থেকে সকাল সোয়া ১০টায় ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায় লঞ্চটি। মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলা কালিগঞ্জ ঘাট পার হওয়ার কিছু সময় পর তিনি খবর পান, এক নারী লঞ্চের তৃতীয় তলা থেকে নদীতে ঝাঁপ দেন।
সঙ্গে সঙ্গে লঞ্চটি ঘুরিয়ে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি নিয়ে লাইফ বয়া ফেলা হয়। একবার ওই তরুণীকে নদীতে ভাসতে দেখা গেলেও কাছে পৌঁছানোর আগেই তিনি তলিয়ে যান। পরে ঘণ্টাখানেক খোঁজাখুঁজির পর কোস্ট গার্ডকে জানিয়ে লঞ্চটি ঢাকার পথে রওনা দেয়।
কর্ণফুলী লঞ্চ কোম্পানির ম্যানেজার আলাউদ্দিন বলেন, “ওই তরুণী নদীতে ঝাঁপ দিয়ে নিখোঁজের পর লঞ্চের এক নারী জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করেন। নদীতে ঝাঁপ দেওয়া তরুণী ধর্ষণের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে ওই ফোন করা ওই নারী অভিযোগ করেন।”
তিনি বলেন, পরে এ ঘটনায় মুন্সীগঞ্জ সদর থানা-পুলিশ ওই লঞ্চের কর্মী রাসেল হৃদয় (৩২), কেবিন বয় শান্ত (২৫) ও শমশেরকে (২৭) হেফাজতে নেন। ঘটনার প্রাথমিক তথ্য শোনার পর তাদেরকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয় পুলিশ।
অভিযোগকারীর বক্তব্যও শোনে থানা পুলিশ।
মুন্সীগঞ্জ থানার ওসি এম সাইফুল আলম বলেন, ১৭ জুন কর্ণফুলী-৪ লঞ্চ থেকে একজন নারী ধর্ষণের শিকার হয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করছে বলে ৯৯৯-এ অভিযোগ আসে। পরে পুলিশ ওই লঞ্চের দুই স্টাফ এবং অভিযোগকারীকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসে।
ঘটনার তথ্য সংগ্রহের পর অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
মারা যাওয়া ওই ছাত্রীর ছাত্রদলে সক্রিয় থাকার তথ্য দিয়ে ভোলা সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সদস্যসচিব ফজলুল করীম ছোটন বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ভোলায় ছাত্র-জনতার সঙ্গে রাজপথে তারও সক্রিয় ভূমিকা ছিল।
তিনি বলেন, তার মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে মঙ্গলবার বেলা ১১টায় সংগঠনের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদসভার আয়োজন করা হয়েছে।
ভোলা সদর মডেল থানায় ওসি হাসনাইন আহমেদ পারভেজ বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত ওই ছাত্রীর মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনে কাজ করছে পুলিশ।













