বুধবার, মে ১৯, ২০২১
spot_imgspot_imgspot_imgspot_img
বুধবার, মে ১৯, ২০২১
Homeবিনোদনফেনীর ঐতিহাসিক বিজয় সিংহ ও রাজাঝির দিঘি ভ্রমণপিপাসুদের প্রশান্তির স্থান

ফেনীর ঐতিহাসিক বিজয় সিংহ ও রাজাঝির দিঘি ভ্রমণপিপাসুদের প্রশান্তির স্থান

হাজার বছরের পুরনো ঐতিহাসিক জনপদের মধ্যে ফেনী অন্যতম। এখানে গৌরবগাঁথা অজস্র নিদর্শন ছড়িয়ে আছে। এর মধ্যে ঐতিহাসিক বিজয় সিংহ ও রাজাঝির দিঘি অন্যতম প্রধান।
ফেনী শহরের ২ কিলোমিটার পশ্চিমে সার্কিট হাউসের পাশে বিজয় সিংহ গ্রামে এটি অবস্থিত। এর তিন দিকে উঁচু পাহাড়ের মতো সবুজ বৃক্ষ ও লতাপাতায় ঘেরা। সমতলে একপাশে গোসল ও ওজু করার ঘাট, মানুষের বসার জায়গা আর সরকারি সার্কিট হাউস।
ফেনী জেলা প্রশাসনের মালিকানাধীন বিজয় সিংহ দীঘির আয়তন ৩৭ দশমিক ৫৭ একর। এখানে হেঁটে-হেঁটে প্রকৃতির সান্নিধ্যে ডুবে থাকা যায়। রোজ বিকেলে প্রশান্তির খোঁজে ভ্রমণপিপাসুরা হাজির হন বিজয় সিংহ দিঘির পাড়ে। এ সময় জমে ওঠে আড্ডা ও বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রীর কেনাবেচা। রাতে আলোর মেলায় এক নৈসর্গিক দৃশ্যের অবতারণা হয়। বিভিন্ন দিবসে ভ্রমণপ্রেমীদের ভিড় বাড়ে। উৎসবগুলোতে পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকে বেড়াতে আসেন এখানে। তরুণ-তরুণীরা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছবি আর সেলফি তোলায় মগ্ন থাকে। তখন মেলাও বসে।
শত বছরের প্রাচীন রূপকথার ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহন করছে বিজয় সিংহ দিঘি। তবে এ নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। অনেকেই এই দীঘিকে প্রাচীন বাংলার বিখ্যাত সেন বংশের অমর কীর্তি মনে করেন। তাদের মতে, ৫০০-৭০০ বছর আগে সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা বিজয় সেন এটি খনন করেন। আবার অনেকে মনে করেন, দিঘিটি খনন করেন স্থানীয় রাজা বিজয় সিংহ। তার নামানুসারেই এর নামকরণ হয়। কথিত আছে, মাকে খুশি করার জন্য এই সুদীর্ঘ দিঘিটি খনন করেন রাজা বিজয় সিংহ।
রাজাঝির দিঘি বা রাজনন্দিনীর দিঘি ফেনীর একটি ঐতিহ্যবাহী দিঘি। ফেনী জেলা শহরের জিরো পয়েন্টে ফেনী রোড ও ফেনী ট্রাংক রোডের সংযোগ স্থলে এর অবস্থান। জনশ্রুতি আছে ত্রিপুরা মহারাজের একজন রাজার কন্যার অন্ধত্ব দূর করার মানসে এ দিঘি খনন করা হয়। স্থানীয় ভাষায় কন্যা’কে ঝি বলা হয়। তাই দিঘিটির নামকরণ করা হয় ‘রাজাঝির দিঘি’। দিঘিটি প্রায় ১০ একরের বেশি জায়গা জুড়ে অবস্থিত। ফেনী জেলা পরিষদ সূত্র জানায়, প্রায় দেড়শ বছর আগে এ দিঘির পাড়ে গড়ে ওঠা প্রশাসনিক কার্যালয়গুলো ১৯৮৪ সালে ফেনী জেলা হওয়ার পর অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়। দিঘির পাড়ে বর্তমানে ফেনী মডেল থানা, ফেনী কোর্ট মসজিদ, অফিসার্স ক্লাব, ফেনী রিপোর্টাস ক্লাব, জেলা পরিষদ পরিচালিত শিশু পার্ক সহ ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন গড়ে উঠেছে।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সংস্কার কাজ বাস্তবায়িত হওয়ায় পাল্টে গেছে ফেনীর ঐতিহাসিক রাজাঝি’র দিঘি ও বিজয় সিংহ দিঘির দৃশ্যপট। শহরের পূর্ব-পশ্চিম দুই প্রান্তে অবস্থিত দিঘিগুলো অব্যবস্থাপনার কারণে ক্রমেই আকর্ষণ হারাতে শুরু করেছিল। কিন্তু ২০১৭ সালের জুলাই মাসে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীন জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের অর্থায়নে ও ফেনী পৌরসভার তত্ত্বাবধানে স্বরূপে ফিরেছে দিঘিগুলো।
ফেনী পৌরসভার উপ-প্রকৌশলী (সিভিল) বিপ্লব কুমার নাথ জানান, ৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয়ে রাজাঝির দিঘি এবং ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে বিজয় সিং দিঘির অবকাঠামোগত সংস্কার এবং উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
দিঘিগুলো ঘুরে দেখা যায়, সুসজ্জিত বাগানের পাশাপাশি সেখানে রয়েছে পর্যটকদের জন্য আলাদা বসার স্থান, বিনোদন কেন্দ্র, হাঁটার পথ, পুরো এলাকায় আলোকসজ্জার ব্যবস্থা। দিনের কর্ম ব্যস্ততা শেষে সন্ধ্যার পর থেকে দিঘির পাড়ে একত্রিত হন বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষজন। রাজাঝির দীঘির পাড় সংলগ্ন জেলা পরিষদ পার্কের তত্ত্বাবধানে রয়েছে বোটিং সুবিধা। বিজয় সিং দিঘিতেও রয়েছে পার্কিং এবং মনোরম পরিবেশে সৌন্দর্য্য অবলোকনের আলাদা স্থান।
রাজাঝির দীঘিতে ঘুরতে আসা আলাউদ্দিন নামে কুমিল্লার এক যুবক বলেন, দিঘির সৌন্দর্য বেড়েছে শুনে বন্ধুদের সাথে এখানে এলাম। সৌন্দর্য্যবর্ধন ও আলাদাভাবে বসার জন্য যে সব ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা সত্যিই অপূর্ব। তবে আলোকসজ্জা ও পার্কিং ব্যবস্থা থাকলে ভালো হতো।
মাহদি হাসান নামে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, সৌন্দর্য্য বাড়ানো হলেও সবসময় মানুষের আনাগোনা থাকায় জায়গাটির পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষকে আরও গুরুত্ব সহকারে ভাবতে হবে। তিনি বলেন, হাঁটার জায়গায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা মোটেও ভালো না। সামান্য বৃষ্টি হলেই এখানে চলার পরিবেশ থাকেনা। দিঘি ঘিরে অবৈধভাবে গড়া উঠা হকারদের নিয়েও অসন্তোষ জানান তিনি।
দিঘির পাড়স্থ কোর্ট মসজিদের এক মুসল্লি বলেন, দিঘির পানিতে ব্যবহার্য বোতলসহ বিভিন্ন প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে পানি ব্যবহারের উপযোগী থাকে না।
শহরের অন্যপ্রান্তে বিজয় সিং দিঘি ঘুরে দেখা যায়, প্রাকৃতিক সৌন্দয্যের অপরূপ দৃশ্য। তিন পাশের উচু পাহাড়ি আবহে একপাশে রয়েছে বসার স্থান।
বিজয় সিং দিঘি দেখতে আসা শাকিল মজুমদার নামে এক পর্যটক বলেন, লক্ষ্মীপুর থেকে পরিবার নিয়ে এখানে এসেছি। সবকিছু সৌন্দর্য্যময় হলেও এখানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও বৃদ্ধি করলে সবার জন্যই ভালো হবে।
দিঘির নিরাপত্তার বিষয়ে জানতে চাইলে ফেনী পৌরসভার মেয়র নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজী বলেন, দিঘির সৌন্দর্য্যবর্ধনের পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
পৌরসভা নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক আজিজুল হক জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স রাগাদ কন্সট্রাকশনের মাধ্যমে গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। এতে দুই দিঘির সৌন্দর্য্যবর্ধনে বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ করা হয়েছে।

অন্যান্য সংবাদ
- Advertisment -spot_img
bn Bengali
X
%d bloggers like this: