রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পঙ্গু হয়ে ফিরলেন কালীগঞ্জের রাজন

- আপডেট সময় : ০৮:৪৪:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬
- / ৫৫১ বার পড়া হয়েছে
উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মালিয়াট ইউনিয়নের গয়েশপুর গ্রামের যুবক রাজন হোসেন (২২)। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আর দালালদের প্রতারণার শিকার হয়ে তাকে উপস্থিত হতে হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহ ফ্রন্টলাইনে। সেখানে ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত হয়ে কোমরের নিচের অংশ অবশ হয়ে যায় তার। দীর্ঘ চার মাসের দুঃসহ যন্ত্রণা, নির্যাতন ও মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে অবশেষে গত ২৩ আগস্ট দেশে ফিরেছেন তিনি।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ৭ মে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রাশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেন রাজন। বিদেশে ভালো চাকরি ও উন্নত জীবনের আশায় তিনি দালালদের মাধ্যমে সেখানে গিয়েছিলেন। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ পরিবারের।
রাজন জানান, যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইউক্রেন সীমান্তবর্তী ফ্রন্টলাইনে ড্রোন হামলার শিকার হন তিনি। বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হয়ে কোমরের নিচের অংশের শক্তি হারিয়ে ফেলেন। চারদিকে মাইন, গোলাবর্ষণ ও ড্রোন হামলার মধ্যে জীবন বাঁচাতে তিনি অসহনীয় কষ্ট সহ্য করেন। আহত অবস্থায় পিঠে প্রায় ৪০ কেজি ওজনের ব্যাগ বহন করে এবং বুকের ওপর ভর দিয়ে চার দিনে প্রায় চার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে রাশিয়ান সেনাদের একটি ক্যাম্পে পৌঁছান।
কিন্তু সেখানে আশ্রয় পেলেও মিলেনি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা। অভিযোগ রয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসার পর তার ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয় এবং তিন দিন বিনা চিকিৎসায় ফেলে রাখা হয়। পরে তাকে রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত ইউক্রেনের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রায় দেড় মাস চিকিৎসার পর স্থানান্তর করা হয় রাশিয়ার আরেকটি হাসপাতালে।
রাজনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই হাসপাতালের একজন মানবিক চিকিৎসক তার করুণ পরিস্থিতি জানতে পেরে রাশিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরবর্তীতে ওই চিকিৎসক এবং দূতাবাসের এক কর্মকর্তার সহযোগিতায় তিনি হাসপাতাল থেকে বের হয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসে আশ্রয় নেন।
দীর্ঘ আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শেষে অবশেষে ক্রাচে ভর দিয়ে গত ২৩ আগস্ট দেশে ফেরেন রাজন। বর্তমানে তিনি নিজ বাড়িতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তবে যুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি ও শারীরিক অক্ষমতা তাকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দিচ্ছে।
রাজনের পরিবার জানায়, চিকিৎসা ব্যয় বহন করা তাদের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং সমাজের বিত্তবানদের কাছে সহযোগিতার আবেদন জানিয়েছেন।
স্থানীয়রা বলছেন, উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে বিদেশে পাঠানোর নামে দালালচক্রের প্রতারণার ভয়াবহ পরিণতির এক জীবন্ত উদাহরণ রাজন। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে ফিরে এলেও রাজনের জীবনে নেমে এসেছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। তবুও পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে আসতে পেরে তিনি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছেন। এখন তার একটাই প্রত্যাশা—সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা।













