ঋণের সুদ কমানোর পথে বাংলাদেশ ব্যাংক

- আপডেট সময় : ০৮:৪৭:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ অগাস্ট ২০২৬
- / ৫৩০ বার পড়া হয়েছে
দীর্ঘ ২১ মাস পর অবশেষে নীতি সুদহার কমিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রেপো রেট ১০ শতাংশ থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী রোববার থেকে নতুন সুদহার কার্যকর হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সিদ্ধান্তে ব্যাংকগুলোর তহবিল সংগ্রহের খরচ কমতে পারে। এর প্রভাবে ধীরে ধীরে ঋণের সুদহারও কমার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গতি ফেরার আশা করছেন ব্যাংকার ও ব্যবসায়ীরা। তবে মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের ওপরে থাকায় সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ।
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটারি পলিসি কমিটির ১৩তম সভায় নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে সভায় দেশীয় ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করে আসছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু টানা তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে থাকায় সুদহার কমানোর সিদ্ধান্তটি অর্থনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
ব্যাংকারদের মতে, নীতি সুদহার কমলে ব্যাংকের অর্থ সংগ্রহের ব্যয় কমবে। ফলে ঋণের সুদহারও কমতে পারে। পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, বাজারে ঋণের সুদ ইতোমধ্যে কমতে শুরু করেছিল। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে বিভিন্ন ব্যাংকে ঋণের সুদহার দশমিক ৫ থেকে ১ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। তবে উদ্যোক্তারা বলছেন, শুধু সুদ কমালেই বিনিয়োগ বাড়বে না। উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, ডলারের অস্থিরতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ব্যবসার বাড়তি খরচ কমানোও জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশে, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খোলার প্রবৃদ্ধিও ছিল মাত্র ২ দশমিক ৩৪ শতাংশ। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৪ শতাংশ কমে ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলারে নেমেছে। তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান মনে করেন, নীতি সুদহার কমানোর সুফল ধীরে ধীরে পাওয়া যাবে। তবে ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করতে সুদের পাশাপাশি ব্যবসা সহজীকরণে সরকারের প্রতিশ্রুতির দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। সিপিডির ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, মূল্যস্ফীতির বড় কারণ বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। দীর্ঘদিন উচ্চ সুদহারের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ায় সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান মনে করেন, মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় এখনই সুদহার কমানোর ফলে চাহিদা বাড়তে পারে। কিন্তু খাদ্য সরবরাহ, আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার ও বাজার ব্যবস্থাপনার সমস্যা বহাল থাকলে মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেকসই বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে শুধু নীতি সুদহার কমানো যথেষ্ট নয়। ব্যবসার ব্যয় কমানো, জ্বালানি ও অবকাঠামো পরিস্থিতির উন্নয়ন, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে। সব মিলিয়ে দীর্ঘ ২১ মাসের কঠোর মুদ্রানীতির পর বাংলাদেশ ব্যাংকের সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত অর্থনীতিতে স্বস্তির বার্তা দিলেও এর সুফল কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগের পরিবেশ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।






























